কিভাবে নতুন জন্ম নিবন্ধন আবেদন করতে হবে ?
জন্ম নিবন্ধন প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ এটি নাগরিকত্বের সাথে সাথে ব্যক্তিগত পরিচয় ও নাগরিক অধিকারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক চালিত (BDRIS) ওয়েবসাইট থেকেই আপনি সহজেই অনলাইনে জন্ম নিবন্ধনের আবেদন করতে পারবেন।
এই আর্টিকেলে আমরা ধাপে ধাপে দেখবো কিভাবে অনলাইনে জন্ম নিবন্ধনের আবেদন করতে হয়, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ফি, এবং অনলাইনে আবেদন প্রক্রিয়ার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো।" "
ধাপ ১: ওয়েবসাইটে প্রবেশ
প্রথমেই আপনাকে https://bdris.gov.bd ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে হবে। এই ওয়েবসাইটে গিয়ে আপনি জন্ম নিবন্ধনের সকল তথ্য এবং নির্দেশিকা সহজেই খুঁজে পাবেন।
ওয়েবসাইটে প্রবেশ করার পর, হোম পেজে একটি স্পষ্ট এবং ব্যবহারকারী-বান্ধব ইন্টারফেস দেখবেন যা আপনাকে পরবর্তী ধাপগুলো অনুসরণ করতে সাহায্য করবে।
ধাপ ২: জন্ম নিবন্ধন মেনু থেকে আবেদন নির্বাচন
ওয়েবসাইটে প্রবেশ করার পর, মেনু থেকে “জন্ম নিবন্ধন” অপশনটি নির্বাচন করুন। এরপর সাব মেনু থেকে “জন্ম নিবন্ধন আবেদন” অপশনটি ক্লিক করতে হবে।
![]() |
জন্ম নিবন্ধন মেনু থেকে আবেদন নির্বাচন |
ধাপ ৩: ঠিকানা নির্বাচন
এই ধাপে আপনাকে নিচের কোন একটি ঠিকানা নির্বাচন করতে হবে:
- জন্ম স্থান
- স্থায়ী ঠিকানা
- বাংলাদেশ দূতাবাসে জন্ম নিবন্ধন আবেদন
![]() |
ঠিকানা নির্বাচন |
ধাপ ৪: নিবন্ধনাধীন ব্যক্তির পরিচিতি
এখানে আপনাকে নিবন্ধনাধীন ব্যক্তির নাম, জন্ম তারিখ, লিঙ্গ, এবং জন্মস্থানের ঠিকানা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করতে হবে। নিচের তথ্যগুলো সঠিকভাবে প্রদান করুন:
![]() |
নিবন্ধনাধীন ব্যক্তির পরিচিতি |
- নামের প্রথম ও শেষ অংশ (বাংলায়): আবেদনে ব্যক্তির পুরো নাম বাংলায় প্রদান করতে হবে।
- নামের প্রথম ও শেষ অংশ (ইংরেজিতে): একই নাম ইংরেজিতে লিখতে হবে।
- জন্ম তারিখ (খ্রিঃ): জন্ম তারিখ সঠিকভাবে নির্বাচন করুন।
- পিতা ও মাতার কত তম সন্তান: এখানে সঠিক সংখ্যা নির্বাচন করুন।
- লিঙ্গ: লিঙ্গ নির্বাচন করুন।
-
জন্মস্থানের ঠিকানা:
- দেশ ও বিভাগ নির্বাচন করুন।
- ডাকঘর (বাংলায় ও ইংরেজিতে) প্রদান করুন।
- গ্রাম/পাড়া/মহল্লার নাম (বাংলায় ও ইংরেজিতে) প্রদান করুন।
- বাসা ও সড়কের নাম ও নম্বর (বাংলায় ও ইংরেজিতে) প্রদান করুন।
এই ধাপটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে দেওয়া তথ্যগুলো ভবিষ্যতে আপনার জন্ম নিবন্ধনের প্রক্রিয়া ও আইডেন্টিটি যাচাইয়ের জন্য ব্যবহার করা হবে। সঠিক তথ্য প্রদান করা নিশ্চিত করুন।
ধাপ ৫: পিতা-মাতার নিবন্ধন নম্বর দিয়ে ফরম পূরণ
এই ধাপে আপনাকে পিতা ও মাতার জন্ম নিবন্ধন বা মৃতো নিবন্ধন নম্বর দিয়ে ফরমটি পূরণ করতে হবে। যদি আপনার পিতা-মাতার নিবন্ধন নম্বর থাকে, তাহলে তা সঠিকভাবে প্রদান করুন।
![]() |
পিতা-মাতার নিবন্ধন নম্বর দিয়ে ফরম পূরণ |
ধাপ ৬: প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আপলোড
অনলাইনে জন্ম নিবন্ধনের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আপলোড করতে হয়। এই কাগজপত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- শিশুর টিকার কার্ড: আবেদন ফরমের সাথে শিশুর টিকার কার্ডের কপি আপলোড করতে হবে।
- পিতা ও মাতার জন্ম নিবন্ধন কার্ড: যদি প্রাপ্তবয়স্ক হয়, তবে পিতা-মাতার জন্ম নিবন্ধন/মৃতো নিবন্ধন নম্বর এবং নিজের এনআইডি কার্ডের কপি আপলোড করতে হবে।
- ডাক্তার কর্তৃক বয়স ভেরিফাই সার্টিফিকেট: প্রাপ্তবয়স্ক হলে অবশ্যই ডাক্তার কর্তৃক ইস্যুকৃত বয়স যাচাইয়ের সার্টিফিকেট জমা দিতে হবে।
এই কাগজপত্রগুলো সঠিকভাবে আপলোড করতে না পারলে আপনার আবেদনটি প্রক্রিয়াকরণে বিলম্ব হতে পারে, তাই নিশ্চিতভাবে সব কাগজপত্রের সঠিক স্ক্যান কপি বা ছবি আপলোড করুন।
ধাপ ৭: আবেদন ফরমের প্রিন্টআউট গ্রহণ
অনলাইনে জন্ম নিবন্ধনের আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর, আপনাকে আবেদন ফরমের একটি প্রিন্ট কপি নিতে হবে।
![]() |
আবেদন ফরমের প্রিন্টআউট গ্রহণ |
এই প্রিন্টআউটটি ভবিষ্যতে ইউনিয়ন বা সিটি কর্পোরেশন অফিসে জমা দিতে হবে।
ধাপ ৮: ইউনিয়ন/সিটি কর্পোরেশন অফিসে জমা দেওয়া
আপনার অনলাইনে করা আবেদন ফরমের প্রিন্ট কপি ইউনিয়ন বা সিটি কর্পোরেশন অফিসে জমা দিতে হবে। অফিসে জমা দেওয়ার সময় নিচের কাগজপত্রগুলোর সাথে ফরমটি জমা দিন:
![]() |
ইউনিয়ন/সিটি কর্পোরেশন অফিসে জমা দেওয়া |
- শিশুর টিকার কার্ড
- পিতা ও মাতার জন্ম নিবন্ধন কার্ড
- প্রাপ্তবয়স্ক ক্ষেত্রে, এনআইডি কার্ড এবং ডাক্তার কর্তৃক বয়স ভেরিফাই সার্টিফিকেট
এই ধাপটি নিশ্চিত করে যে আপনার অনলাইনে করা আবেদনটি সরকার কর্তৃক বৈধতা প্রদান পাবে এবং প্রয়োজনে আপনার ফিজিক্যাল কপি অফিসে রেকর্ড হিসেবে থাকবে।
ধাপ ৯: ফি পরিশোধ ও রশিদ গ্রহণ
সব ঠিক থাকলে, এখন আপনাকে নির্ধারিত ফি পরিশোধ করতে হবে। জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে:
- শিশুর ক্ষেত্রে ফি: ৫০ টাকা
- প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে: ৫০ টাকা বা তার বেশি (অফিস টানানোর চার্ট অনুযায়ী)
![]() |
ফি পরিশোধ ও রশিদ গ্রহণ |
ফি পরিশোধের পর, আপনাকে রশিদ গ্রহণ করতে হবে যা আপনার আবেদন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রশিদ প্রাপ্তির মাধ্যমে আপনার আবেদনটি সরকার কর্তৃক গ্রহণযোগ্য হবে এবং আপনাকে প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যাওয়া নিশ্চিত করা হবে।
আবেদন প্রক্রিয়ার সময়সীমা ও ফলো-আপ
সর্বোপরি, অনলাইনে জন্ম নিবন্ধনের আবেদন করার পর সাধারণত ৩ থেকে ৫ দিনের মধ্যে আপনার জন্ম নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে যাবে। এই সময়ে আপনি আবেদন ফরমের অবস্থা ও অন্যান্য আপডেট সম্পর্কে ওয়েবসাইট অথবা স্থানীয় ইউনিয়ন/সিটি কর্পোরেশন অফিসের মাধ্যমে জানতে পারবেন।
অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়ার সুবিধা
অনলাইনে জন্ম নিবন্ধনের আবেদন প্রক্রিয়া গ্রহণের বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে:
- সহজ ও সময় সাশ্রয়ী: আবেদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইনে সম্পন্ন হওয়ায় সময় ও প্রচেষ্টা সাশ্রয় হয়।
- তথ্যের নির্ভুলতা: সঠিক তথ্য প্রদান করলে ভবিষ্যতে কোনো বিভ্রান্তি বা সমস্যার সম্ভাবনা কমে যায়।
- সরকারি সেবা প্রসারের অংশ: অনলাইন সেবার মাধ্যমে নাগরিক সেবা আরও সহজলভ্য হচ্ছে।
তবে, কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে, যেমন:
- ইন্টারনেট সংযোগের সমস্যা: দুর্বল বা অনুপযুক্ত ইন্টারনেট সংযোগে আবেদন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হতে পারে।
- কাগজপত্র স্ক্যান ও আপলোড: সব ধরনের কাগজপত্র সঠিকভাবে স্ক্যান করে আপলোড করতে না পারলে আবেদন গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।
- ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা: অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করতে গিয়ে সাইবার হামলার ঝুঁকি থাকতে পারে।
এই চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিত ওয়েবসাইট আপডেট, সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি করার কাজ করছে।
সফল আবেদন প্রক্রিয়ার টিপস
নিচে কিছু টিপস দেয়া হলো, যা অনুসরণ করলে আপনার জন্ম নিবন্ধনের আবেদন প্রক্রিয়া আরো সহজ এবং সফল হবে:
- ইন্টারনেট সংযোগ চেক করুন: আবেদন করার পূর্বে আপনার ইন্টারনেট সংযোগ স্থিতিশীল কিনা তা যাচাই করুন।
- সঠিক তথ্য প্রদান: সব তথ্য যেমন নাম, জন্ম তারিখ, ঠিকানা ইত্যাদি সঠিকভাবে প্রদান করুন।
- স্ক্যান কোয়ালিটি নিশ্চিত করুন: কাগজপত্রের স্ক্যান কোয়ালিটি ভালো কিনা তা পরীক্ষা করে নিন যাতে কোনো তথ্য অস্পষ্ট না হয়।
- সময় মতো আবেদন সম্পন্ন করুন: নিয়মিত ওয়েবসাইট চেক করুন এবং সময় মতো আবেদন ফরম পূরণ করুন।
- যোগাযোগের তথ্য সঠিক দিন: কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগের জন্য সঠিক ফোন নম্বর এবং ইমেইল আইডি প্রদান করুন।
আবেদন প্রক্রিয়ার সাধারণ প্রশ্নাবলী (FAQ)
নিচে কিছু সাধারণ প্রশ্ন এবং উত্তর দেয়া হলো যা অনলাইনে জন্ম নিবন্ধনের আবেদন সম্পর্কিত আপনার সকল সংশয় দূর করতে সাহায্য করবে:
- উত্তর: হ্যাঁ, শিশুর ক্ষেত্রে ৫০ টাকা এবং প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে ৫০ টাকা বা তার বেশি ফি দিতে হয়, যা অফিস টানানোর চার্ট অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।
- উত্তর: নিবন্ধনাধীন ব্যক্তির নাম (বাংলা ও ইংরেজিতে), জন্ম তারিখ, পিতা-মাতার নিবন্ধন নম্বর, জন্মস্থানের ঠিকানা, এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য প্রদান করতে হবে।
- উত্তর: শিশুর টিকার কার্ড, পিতা-মাতার জন্ম নিবন্ধন কার্ড, এবং প্রাপ্তবয়স্ক ক্ষেত্রে এনআইডি কার্ড ও ডাক্তার কর্তৃক ইস্যুকৃত বয়স যাচাইয়ের সার্টিফিকেট আপলোড করতে হয়।
- উত্তর: সব ঠিক থাকলে ৩ থেকে ৫ দিনের মধ্যে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে যায়।
- উত্তর: সমস্যার সমাধানের জন্য ওয়েবসাইটে দেয়া যোগাযোগ নম্বর অথবা সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন/সিটি কর্পোরেশন অফিসের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।
প্রশ্ন ১: অনলাইনে জন্ম নিবন্ধনের আবেদন করতে কি কোনো ফি দিতে হয়?
প্রশ্ন ২: আবেদনের ফরম পূরণের সময় কোন তথ্যগুলো প্রদান করতে হবে?
প্রশ্ন ৩: কোন কাগজপত্রগুলো অনলাইনে আপলোড করতে হয়?
প্রশ্ন ৪: আবেদন করার পর কতদিনের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন সম্পন্ন হয়ে যায়?
প্রশ্ন ৫: যদি অনলাইনে কোনো সমস্যা হয়, তাহলে কার সাথে যোগাযোগ করতে হবে?
শেষ কথা
সর্বোপরি, অনলাইনে জন্ম নিবন্ধনের আবেদন প্রক্রিয়া অত্যন্ত সহজ এবং সময় সাশ্রয়ী। সঠিক তথ্য এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের মাধ্যমে আবেদন প্রক্রিয়াটি দ্রুত ও নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করা যায়। বিডিআরআইএস ওয়েবসাইটে দেওয়া নির্দেশাবলী মেনে চললে, আপনার জন্ম নিবন্ধন নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
এই আর্টিকেলটি আপনাকে জন্ম নিবন্ধনের আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কিত সকল জটিলতা ও সংশয় দূর করতে সহায়তা করবে বলে আমরা আশা করি। প্রয়োজনে আবারও ওয়েবসাইটটি পরিদর্শন করুন এবং নিয়মিত আপডেট সম্পর্কে তথ্য নিন।
তথ্য আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url